‘
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে স্বামী-সন্তান হারা রহিমার বিলাপ কক্সবাজারের উখিয়া সংবাদদাতা সম্প্রতি গিয়েছিলেন বালুখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে। তার সাথে কথা হয় সেসব ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বিতাড়িত ‘রোহিঙ্গাদের’ সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে চলমান সংকটের বিভিন্ন বিষয়। রোহিঙ্গা শিক্ষিত যুবক ও ব্যবসায়ীরা তুলে ধরেন তাদের মতামত। এসময় মিয়ানমার সরকারের মনোভাব ও রাখাইনে ফেরা নিয়েও সংশয়ের কথা ব্যক্ত করেন আশ্রিতরা।
আলাপচারিতায় বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মংডু টাউনের রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী শরিফুল্লাহ (৪৫) বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের কথায় এবং কাজের মধ্যে কোন মিল নেই।’ শরিফুল্লাহ আকিয়াব নামে এক যুবক যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি নিয়মিত রেডিও’র খবর শুনেন। এদেশে এসেও এফএম রেডিও’র খবর শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শুনা খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে শরিফুল্লাহ আকিয়াব বলেন, ‘মিয়ানমার রেডিও দিনে দু’বার খবর প্রচার করছে। এখনো ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে (টোয়ে মিলং) অর্থাৎ পালিয়ে যাও। নইলে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে।আরসা’র সেই কথিত হামলা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। এ হামলার অজুহাতে মূলত রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করাই তাদের উদ্দেশ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু মৌলিক অধিকার ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত শিক্ষিত রোহিঙ্গার সাথে কথা বলে জানা যায়, আরাকানের বিদ্রোহী সংগঠন ‘আরসা’ মিয়ানমারের সৃষ্টি বলে দাবী করে রোহিঙ্গা নেতা ডাক্তার জাফর আলম বলেন, ‘ভয়াবহ নির্যাতন, নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শিক্ষিত ও সচেতন রোহিঙ্গারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। গত বুধবারে মিয়ানমারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্শিয়ালের কাছে মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অং লেইন রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারো বাঙালি হিসেবে অভিহিত করেছে। জেনারেল মিন অং লেইন ফেসবুক পেজে বৃহস্পতিবার এ বক্তব্য প্রচার করে বুঝিয়ে দিলেন মিয়ানমারের ভূখণ্ড থেকে রোহিঙ্গাদের চিরতরে তাড়িয়ে দেওয়ায় তাদের উদ্দেশ্য। কারণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর মিয়ানমারের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও দেশটির সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছেন সে দেশের সেনাবাহিনী।’
মাস্টার আমিন উল্লাহ (৫৫) বুচিডং টং বাজার হাইস্কুলে অনেক দিন শিক্ষকতা করেছেন। আর্থিকভাবে সচ্ছল আমিন উল্লাহ স্ত্রী-সন্তানসহ ৯ পরিবারের সদস্য নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন থাইংখালী বাঘঘোনা ক্যাম্পে। ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের কথিত বিদ্রোহী সংগঠন আরসা সামরিক জান্তার সৃষ্টি। কোন দিন আরসা’র নাম আমরা শুনেনি। ২৫ আগস্ট সেনা ক্যাম্পে নাটকীয় হামলার পর থেকে আরসার নাম শুনা যাচ্ছে। এ অজুহাতে মিয়ানমার সেনা পুলিশ রোহিঙ্গাদের উপর যে দমন নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত।’
মংডুর ডুয়েল তলী ইউনিয়নের হুক্কাট্টা (চেয়ারম্যান) জামাল হোসেন সিকদার সপরিবারে থাইংখালী হাকিম পাড়া বস্তিতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তাদের পরিচয় পত্রে জাতি হিসাবে পরিষ্কার লিখা ছিল রোহিঙ্গা। ১৯৮৯ সালে তাদের নতুন ফরম পূরণ করিয়ে জাতি হিসাবে মুসলিম লিখা হলেও ১৯৯৫ সাল থেকে লেখা শুরু হয় বাঙালি। থেইন সেইন এর আমলে রোহিঙ্গাদের যাবতীয় কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়। পরে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশনের নামে যেসব ফরম পূরণ করা হয় সেগুলো বার্মিজ ভাষায় লিখা থাকলেও পূরণ করতে বলা হয় বাংলায়। রোহিঙ্গারা তাদের সে নির্দেশ পালন না করায় নতুন কোন কার্ড রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৫ সালে এনডিসির কথা বলে, কিছু কিছু রোহিঙ্গাদের মাঝে জোর করে বাঙালি লিখা কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রতীয়মান হয় রোহিঙ্গাদের নির্মূল করাই তাদের এ দূরবীসন্ধি।’ এসময় সোহেল আহমদ (৩৮) নামের এক শিক্ষিত যুবক বলেন, ‘আমার বাবা মৃত আমির শরীফ দীর্ঘদিন যাবত মিয়ানমার সরকারের চাকরি করেছেন। তাদের অনেক জমিজমা গাড়ি-বাড়ি সহায় সম্পত্তি ছিল এখন আর কিছু নেই। সব হারিয়ে আমরা এখন পথের ভিক্ষুক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে ফিরতে চাই।’
রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, মিয়ানমারের এক মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে যাওয়ার পর প্রত্যাবাসন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে মর্মে মিথ্যা আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে গেছে। তাদের দেওয়া দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবকে মিয়ানমারের ধোঁকাবাজি বলে দাবী করেছেন। রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, মিয়ানমারের আরসা ইস্যু নিয়ে রোহিঙ্গা মুক্ত রাখাইন এলাকা করার পরিকল্পনা নিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন নিপীড়ন, হত্যা, গুম জ্বালাও পোড়াও অব্যাহত রেখেছে।
