লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত খালেদা জিয়া

ঢাকা, ১৯ অক্টোবর : সরকারের প্রতিহিংসা মূলক গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে বুধবার দেশে ফিরেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।

বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে গুলশান নিজ বাসার উদ্দেশে যখন রওনা করেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপোষহীন এই নেত্রী, তখন গোটা রাজপথ যেনো এক জনসমুদ্র। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে প্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নিতে লাখো নেতাকর্মী নেমে আসেন রাজপথে। বিমানবন্দর থেকে গুলশান তিল ধারনের ঠাঁই নেই। ‘খালেদা জিয়া ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ শ্লোগানে প্রকম্পিত ঢাকা নগরী।

খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে সকাল থেকেই দলের লাখো নেতা কর্মীর সমাগম হয় বিমানবন্দরে। খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজধানীর এমইএস থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নেয়। নেতাকর্মীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাদের বিমানবন্দর পর্যন্ত পুলিশ যেতে বাধা দিয়েছে।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির নেতা, জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলের চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা দিতে উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মী বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। কর্মীদের উজ্জীবিত করতে স্লোগান দিচ্ছেন অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।

বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে যখন খালেদা জিয়া বিমানবন্দরে এসে নামেন, তখন খুশিতে আত্মহারা নেতাকর্মীরা বিমানবন্দর সড়কের পূর্ব পাশে অবস্থান নেয়া কর্মী-সমর্থকরা মূল রাস্তায় নেমে এসে মিছিল করতে থাকে। বিমানবন্দরের সামনে গোলচত্বর থেকে হোটেল রেডিসন পর্যন্ত রাস্তায় মিছিল করেছে তারা।

বুধবার বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসভবন পর্যন্ত সড়কে অবস্থানকারীদের মধ্যে কিছুটা উৎকণ্ঠা থাকলেও খালেদা জিয়াকে একেবারেই নির্ভার দেখাচ্ছিল। তিনি হাসি মুখে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের অভ্যর্থনার জবাব দিয়েছেন। বাসভবনে পৌঁছার পর বিএনপিপ্রধানকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দলীয় নেতারা। তাঁর গাড়ি বাসভবনে ঢোকার পর তাঁকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। এ সময় নেতারা কুশল বিনিময় করে চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর জানতে চান। চেয়ারপারসনের উপদেষ্ট কাউন্সিলের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল কাইয়ুম, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।

এর আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে ভিআইপি লাউঞ্জে বিএনপি চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা জানান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ূম। ভিআইপি লাউঞ্জে সিনিয়র নেতাদের প্রবেশের জন্য আবেদন করা হয়েছিল যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু তাঁদের না যেতে দেওয়ায় বিমানবন্দর মসজিদের কাছে সড়কের এক পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান তাঁরা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি এলে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, এডভোকেট রুহল কবির রিজবী প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া দলের নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, মীর নাছির, খন্দকার মাহবুব হোসেন, বরকতউল্লা বুলু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, গিয়াস কাদের চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, আহমেদ আজম খান, রুহুল আলম চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, লুত্ফর রহমান খান আজাদ, মাহবুব উদ্দিন খোকন, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, বিলকিস জাহান শিরিন, সানাউল্লাহ মিয়া, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ, আফরোজা আব্বাস, হেলেন জেরিন খান, সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, রাজীব আহসান, আকরামুল হাসানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দর মোড় থেকে বনানীর কাকলী পর্যন্ত সড়কের এক পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী সমবেত হয়। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, দিলদার হোসেন সেলিম, তানভীর আহমেদ রবিন, মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগরের সভাপতি শহীদুল ইসলাম শহীদসহ নেতারা তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ঢাকায় বসবাসকারী নেতাকর্মীদের নিয়ে অবস্থান করেন এবং বেগম খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান। তাঁদের কারো কারো হাতে ছিল ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’সহ বিভিন্ন ব্যানার। ছাত্রদল ঢাকা মহানগর (পশ্চিম) শাখার নেতাকর্মীদের মিছিলে অংশ নেওয়া সবার পরনে ছিল সাদা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের পেছনে লেখা ‘দুর্নীতি-দুঃশাসন হবে শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’।

বেগম খালেদা জিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছার আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁদের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িতে পুলিশ বাধার সৃষ্টি করেছে। মওদুদ আহমদ বলেন, আমাদের নেত্রী দেশে ফিরবেন বলে দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে। অথচ আপনারা দেখবেন পুলিশ কতভাবে তাদের বাধা দিচ্ছে। বিমানবন্দর সড়কে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে লোক সমাগম না হয়। তার পরও ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—জনগণ দেশনেত্রীর আগমনে শুভেচ্ছা জানাতে প্রস্তুত।

মওদুদ আরো বলেন, আমাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে সরকার রাজনৈতিক মনোভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে তিনি ভয় পান না। আমাদের নেত্রী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে ওই সব মামলায় জামিন নেবেন।

পুলিশ সদস্যদের হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ করতে দেখা যায়। বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জলকামানের দুটি গাড়ি, প্রিজন ভ্যানসহ পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বিমানবন্দরের ভেতরে পুলিশ ছাড়াও সোয়াত, ব্যাটালিয়ন পুলিশের বেশ কয়েকটি দলের সদস্যরা ছিলেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকাল আড়াইটা থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকে। বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে বিমানবন্দরের উল্টো পাশের রাস্তা থেকে খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, বনানীর কাকলী মোড় পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রাস্তার ডান পাশে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেয়। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন, ছোট ছোট পতাকা। কয়েকটি জায়গায় দেখা গেছে ব্যান্ড পার্টিও। সাধারন পথযাত্রিকেও যানজটের ভোগান্তি ভুলে মিছিল সমাবেশে সামিল হতে দেখা যায়।

পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আজকে বিমানবন্দরের বাইরে লাখ লাখ মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে প্রাণের অন্তস্তল থেকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। এই সংবর্ধনা নজিরবিহীন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এবং সর্বস্তরের জনগণ দেশনেত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। এই সংবর্ধনা প্রমাণিত হয়েছে—বেগম খালেদা জিয়া দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। দেশের মানুষ যেভাবে তাঁকে ভালোবাসে, গণতন্ত্রের জন্য তিনি যেভাবে সংগ্রাম করছেন, সেই সংগ্রামকে আমরা যেন অব্যাহত রাখতে পারি এবং বিজয় অর্জন করতে পারি—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এর আগে লন্ডনের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা ১৫ মিনিট) খালেদা জিয়াকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিমানটি (ইকে-৫৮৬) হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশে ছাড়ে।

বিমানে ওঠার আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। ভিআইপি টার্মিনাল থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে এই বক্তব্য দেন তিনি। নেতাকর্মীরা বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে দলীয়প্রধানের বক্তব্য শোনেন।

পরে দুবাই থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন খালেদা জিয়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এমন একসময়ে দেশে ফিরছেন, যখন তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

গত ১৫ জুলাই চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন। বড় ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন।

Related posts

Leave a Comment