বিশেষজ্ঞরা দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর বা পাচার ঠেকাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সুশাসন জোরদার এবং বাণিজ্য, আর্থিক ও কর আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তারা অর্থ পাচার প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন। কমিশন পাচার ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রহণ করতে পারবে।
শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ’ শীর্ষক এক সংলাপে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা এসব মতামত তুলে ধরেন।
সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় সংলাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও ড. আকবর আলী খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ড. সাইদুজ্জামান, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ, বেসরকারী গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিউিটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কে মুজেরী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিস এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ও বর্তমান সদস্য স্বপন কুমার বালা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ ভূইয়া প্রমূখ আলোচনায় অংশ নেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থ পাচার ঠেকাতে দেশের মধ্যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরো উন্নততর করতে হবে। কর আইনসহ বিভিন্ন নীতিগত দিক সংস্কার করতে হবে। যাতে ব্যবসায়ীদের মনে ধারনা হয়, এখানে বিনিয়োগ করলে তারা রিটার্ন বেশি পাবেন।
অর্থ পাচার ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে স্বাধীন কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করে ড. আকবর আলী খান বলেন, আইনী সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদারে একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে যেখানে পুলিশ, দুদক, কাস্টমস, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জনবল থাকবে। এতে বিদ্যমান আইনী কাঠামোয় সরকারের সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব রয়েছে,তা দূর হবে।পাশাপাশি সক্ষমতাও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, দেশে বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশের অপ্রতুলতা রয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতিও একটা বড় ব্যাপার। এসব কারণে অর্থ পাচার হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে টাকা রাখলে নিরাপদে থাকবে, এই আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে স্বর্ণ চোরাচালান এবং বৈদেশিক অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাবেক গভর্নর বলেন, মুদ্রা বিনিময়হার বাজারভিত্তিক করতে হবে। বাজারের সাথে সমন্বয় রেখে বিনিময় হার নির্ধারণ করলে ছোটখাটো পাচার ঠেকানো যাবে। টাকা অতি মূল্যায়নের কারনে রেমিটেন্স কমে যাচ্ছে এবং অর্থ পাচার হচ্ছে।
তিনি বাণিজ্য উদারীকরণ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, অনেকেই ক্যাপিটাল একাউন্ট লিবারেলাইজেশনের কথা বলছেন। মনে হয় এটা এখন করার সময় এসেছে।
এফবিসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, কেবল চোরাচালান হওয়া স্বর্ণ উদ্ধার করলে হবে না। যারা এর সাথে জড়িত তাদের শাস্তি দিতে হবে। তিনি পণ্যের খুচরা মূল্য নির্ধারণে দেশে স্বাধীন প্রাইস কমিশন গঠনের সুপারিশ করেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ বা পুঁজির পুরোটা বিনিয়োগ হচ্ছে না। একটা অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটা রোধ করতে হবে। তিনি এই পাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পাচারের অর্থ গ্রহণকারী দেশের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থ পাচার ঠেকাতে ‘কমিশন’ গঠনের সুপারিশ
