
শেখ বাশার ,১৭ এপ্রিল ২০২০(বিবিনিউজ): শিশু কন্যা সন্তান মানহা। মা’কে ছাড়া থাকতে তার অনেক কষ্ট। মায়ের অপেক্ষায় থাকে সারাক্ষন। গাড়ীর শব্দ পেয়ে দৌড়ে আসতে চায় । এর পরেও মানহাকে বাসায় রেখে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তার করোনা যুদ্ধে দিন-রাত মাঠে মাঠে কাজ করছেন।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। যা ইতোমধ্যেই আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। অনেকে মারা গেছে এবং অসুস্থের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। করোনা মোকাবেলায় যেখানে দম ফেলার সময় নেই দেশের ডিসি,এসপি,সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। বিভিন্ন পদক্ষেপে এই পদবীর মানুষগুলো মহামারী এই ভাইরাসকে রুখে দিতে চেষ্টা করছেন। অপরদিকে ইউএনও এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগনের বিভিন্ন কর্মকা- ভ’মিকা রাখছেন মানুষকে আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে ।মানিকগঞ্জে এরই মধ্যে এক নারী ইউএনও’র মানবিক গুনাবলী সবার নজর কেড়েছে।

তিনি নিজের শিশু কন্যা সন্তানকে বাসায় রেখে করোনা মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক ঘিওর উপজেলাতেও ব্যাপক কাজ করা হচ্ছে আইরিন আক্তারের নেতৃত্বে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সকল ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে একজন কলেজ প্রতিনিধি, একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিনিধি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সকল ইউপি সদস্য, সকল সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের সমন্বয়ে একটি করে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা ব্যাপী মাইকিং, ইসলামি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রায় সকল মসজিদে ইমামদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধের নিয়মগুলো আলোচনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সচেতনতার লক্ষ্যে উপজেলার প্রত্যেক বাজারে লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার দেয়া হয়েছে । মসজিদে মুসল্লী উপস্থিতি সিথিল করা হয়েছে । এর পরও দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সকল অফিসারদের স্বশরীবে উপস্থিত হয়ে এবং ফোনে নিয়মিত খোজখবর নিচ্ছেন তিনি।

আইরিন আক্তার বলেন,সরকারী ভাবে বরাদ্ধ পেয়েছি ৩৫ মেঃটন চাল এবং নগদ ৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা । বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে তা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে । বেসরকারী হিসাব ছাড়াই সরকারী ভাবে এ পর্ষন্ত ৩০০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরন করা হয়েছে ।বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ৫৫ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে । এলাকায় কোন ব্যক্তি মারা যায়নি এবং আইসোলেশনসহ কোন লকডাউন নেই। করোনা ভাইরাস থাকা অবস্থায় অসহায় দরিদ্রদের মাঝে সার্বিক সহযোগীতা অব্যাহত রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল আলমের সহযোগীতায় অন্যান্য পুলিশ ও সেনাবাহিনী সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জনসমাগম এড়ানো ও দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। সরকার প্রদত্ত চাল, আলু, ডাল ও সাবান উপজেলার গরীব ও দুস্থ মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। ঘিওর বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ও রাস্তায় জীবাণুনাশক ব্লিচিং পাউডার স্প্রে করেছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাগম এড়ানোর জন্য যখনই ফোন কল আসছে তাৎক্ষণিক ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। এলাকায় রেশন কার্ড তৈরী করে প্রাপ্ত ব্যক্তিদের ন্যায্য মূল্যে রেশন সরবরাহ করা হয় । আর যারা সম্পাদশালী হওয়ার পর মিথ্যা কথ্য দিয়ে সরকারী ত্রাণ গ্রহণ করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পিছপা হচ্ছেন না। সার্বিক সহযোগীতা করছেন উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাবিবুর রহমানহাবিব,দুই জন ভাইস চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিসহ সকল স্তরের লোকজন ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউএনও আইরিন আক্তার নিজস্ব উদ্যোগে লিফলেট আকারে একটি বিশেষ ঘোষণা বের করেছেন। তাতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া সকল নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নির্দেশনায় তিনি উল্লেখ করেছেন, বিদেশ ফেরত প্রত্যেক ব্যক্তি ১৪ দিন অবশ্যই নিজ বাড়ীর কক্ষ থেকে বের হতে পারবেন না। তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ তার থেকে আলাদা থাকবেন। তার থালা, বাটি, গ্লাস, কাপড়সহ অন্যান্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা করে রাখতে হবে এবং ওই পরিবারের সদস্যরা মসজিদসহ কোনো ধরনের লোক সমাগমে যেতে পারবে না। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপজেলায় সকল প্রকার গণজমায়েত, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সমাবেশ না করার নির্দেশনা। প্রয়োজন ছাড়া জনসাধারণকে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ এবং যত্রতত্র বাজার, মোড় বা দোকানে অযথা আড্ডা এবং যেকোনো ধরনের খেলাধুলা করা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। উপজেলার সকল স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কোচিং সেন্টার অনিদিষ্ট কালে জন্য বন্ধ ঘোষণা। এ সকল নির্দেশনা না মানলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সন্ধ্যার পর বিশেষ কাজ ছাড়া কেউ বের হতে পারবেন না। ন্যায্য মূল্যের চাল সরকারী নিয়ম মোতাবেক প্রদান করা হচ্ছে । কোনো ব্যক্তি এই নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, নিকটবর্তী পুলিশ কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যকর্মীকে অবহিত করতে হবে এবং যেকোনো বিষয়ে সহযোগিতার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বসানো হয়েছে। এছাড়া আইন অমান্য করায় অনেককে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের ওষধ আছে মর্মে প্রচার করে জনগনের সাথে প্রতারনার অবিযোগে এক হোমিও ডাক্তারকে ৬ মাসের কারাদন্ড দিযেছেন। তিনি ঘিওর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএন্ডএফপিও ডাঃ সোমেন চৌধূরীর সার্বিক সহযোগীতায় ডাক্তারদের উপস্থিতির মাধ্যমে এ মহামারীর মধ্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

ঘিওর উপজেলার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, একজন দক্ষ নারী আইরিন আক্তার । তাঁর কাছে অনেক কিছু শিক্ষার রয়েছে। শিশু সন্তানকে বাসায় রেখে সরকারের নির্দেশনা মেনে সাধারণ মানুষের জন্য তিনি নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছেন। তিনি নিজে ফিল্ডে কাজ করছেন আবার দায়িত্ব প্রাপ্ত অন্যান্য অফিসাররা কে, কোথায়, কিভাবে কাজ করছন তার সার্বিক তদারকি করছেন। এলাকাবাসী জানান, তাদের দেখা চৌকস একজন অফিসার আইরিন আক্তার ।তিনি করোনা প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করছেন তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তার বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য এমএম নাইমুর রহমান দূর্জয় ,মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক –এসএম ফেরদৌস এবং উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাবিবুর রহমান হাবিব মহোদয়ের নিদের্শ ও তদারকিতে আমরা সফল ভাবে কাজ করে যাচ্ছি,আমার কাছে দায়িত্বটা অনেক বড়। সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আমি চাই এ উপজেলা করোনাভাইরাস মুক্ত থাকুক। করোনা মোকাবেলায় তাই সকলকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরো বলেন,জাতির এই সংকটময় সময়ে যারা আমার অর্থ্যাৎ সরকারী কাজে সহযোগীতা করছেন তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তারের স্বামী বিএম রুহুল আমিন রিমন দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্য্যালয়ে । বর্তমানে তিনি বদলী হয়ে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করার কথা রয়েছে।
