
সাভার প্রতিনিধি(বিবিনিউজ):বেদে সম্প্রদায় যারা এক সময় সাপ খেলা দেখে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন আর আগের মত মানুষ সাপ খেলা না দেখায় জীবন যাপন করতে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। বলছি সাভারের বেদে সম্প্রদায়ের কথা। ঢাকা থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার এলাকা পাড়ি দিয়ে এই বেদে গ্রামে আসতে হয়। এই গ্রামে বসবাস করছে প্রায় ১৫ হাজার বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। এদিকে বেদেদের কষ্টের কথা চিন্তা করে দুর্যোগ সহনীয় ঘর করে দিচ্ছে সরকার।
রাজধানীর ঢাকার অদূরে সাভারের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বংশী নদী। নদীর পাশের বেদে গ্রাম বা সাপের পল্লীর কথা হয়তো অনেকেরই জানা। সাভারের অমরপুর, পোড়াবাড়ি, কাঞ্চনপুর ও বক্তারপুর এলাকা নিয়ে ‘সাভার বেদে পল্লী গ্রাম। এ পল্লীতে প্রায় দুই’শ বছর ধরে ১৫ হাজারেরও বেশি বেদের বসবাস। এক সময় তারা নৌকায় বসবাস করলেও এখন অধিকাংশ গৃহস্থদের ন্যায় পাকা, আধা পাকা ও টিন দিয়ে ঘর বানিয়ে বসবাস করছে। পেশারও পরিবর্তন হয়েছে অনেকের। বেদে সম্প্রদায় তাদের আদি পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। সাপের খেলা দেখানো, টোটকা চিকিৎসা, ঝার-ফুক, তাবিজ-কবজ বিক্রি সিংগালাগান ছেড়ে আধুনিকায়ন সভ্যতায় আসছেন এ সম্প্রদায়। সরকারী ভাবে প্রায় পঞ্চাশটি বেদে পরিবারকে দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতায় তাদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ও হিন্দু পরিবার। তবে তাদের জীবনযাপন একটু ভিন্ন রকম। বেদে সম্প্রদায়ের সংসারে আয়-উপাজর্ন পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি। এক সময় সাপ খেলা দেখে যা আয় হতো তা দিয়েই সংসার চলতো তাদের। এখন আর আগের মত মানুষ সাপ খেলা না দেখায় তাদের আয় উপাজন কম হচ্ছে। ছোট ছোট টংঘর করে তারা বসবাস করেন এই এলাকায়। প্রতিদিন বেদে সম্প্রদায়ের নারী ও পুরুষরা বিভিন্ন গ্রাম হাট বাজারে গিয়ে সাপ খেলা দেখান। তাদের মধ্যে বেদে নারীরা অন্যতম। বেদে নারীরা বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিভিন্ন মানুষকে সিংগালাগানসহ তাবিজ কবজ বিক্রি করেন। এখন আরও সেই সাপ খেলা মানুষ না দেখায় অনেক বেদে অন্য পেশায় চলে গেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাপ নিয়ে আসতো বেদে সরদাররা ওই বেদে গ্রামে সেখানে আগে প্রতিদিন সাপ বেচা কেরার বাজার বসতো এখন সাপের হাট বন্ধ রয়েছে। সেই সাপ দিয়ে তারা খেলা দেখাতেন মানুষের মাঝে। মানুষ সাপ খেলা দেখে যা টাকা দেন তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে। এখানো উল্লেখ যোগ্য যে সাপ দিয়ে সাপ খেলা দেখানো হয় সেই সাপগুলো হলো লাউ ডোগা, কেউটে, কাল নাগিনী, দু-মাথাওয়ালা, কাটা দুধল বা সোয়া সাংকিনি ও সোরাশ সাপ। ২০১৪ সালেও বেদে সম্প্রদায় গ্রামে ছিলো মাদকের ভয়াভহ বিস্তার অনেক নারী ও পুরুষ মাদক বিক্রির সাথে জড়িত ছিলো। কিন্তু এখন আর সেখানে মাদকের তেমন ভয়াভহতা নেই বললেই চলে। এখন কাজ করে সংসারের হাল ধরছেন অনেকেই বেদে। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবীবুর রহমান সাভারে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করতে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য তিনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। বেদে গ্রামে করে দিয়েছেন তিনি একটি তৈরি পোশাক কারখানা । সেই গার্মেন্টসে কাজ করে বেদে নারীরা স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন। শিক্ষার আলো ছড়াতে তাদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত করেছেন ডিআইজি হাবীব। বেদে পল্লীর অভ্যন্তরে ১২টি রাস্তা উন্নয়ন, একটি ঈদগাঁসহ যুবকদের কর্মসংস্থান করা হয়েছে। এদিকে বেদে সম্প্রদায় বেচে থাকার জন্য সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। বেদে সম্প্রদায়ের নারী এক সময় পাঁচ থেকে আটটি করে সন্তান নিলেও এখন তারা চিকিৎসকের পরামর্শে দুটি করে সন্তান নিচ্ছেন।
বেদে সম্প্রদায় মানুষের উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা.এনামুর রহমান।
বেদে স্প্রদায়ের নেতা ও উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ বলেন, মাদক ব্যবসা যে এলাকার চিরচেনা রুপ ছিল সেই বেদেপল্লীতে দিন বদলে ছোয়া লেগেছে। থেমে গেছে নিজেদের মধ্যকার বিবাদ। বন্ধ হয়েছে বহুবিবাহ। জীবনমান বদলে যাওয়ায় ওই এলাকায় ঘরে ঘরে এখন কর্মত্র মানুষ। একসময়ের অলস মানুষগুলোর এখন কর্মব্যস্ত জীবন। তিনি আরও জানান সাপ খেলা দেখার সময় অনেক সাপুড়ে সাপের কামড়ে অনেক সময় মারাও যান।
সরকারী ভাবে বেদে সম্প্রদায় মানুষে সাহায্য সহযোগীতা করলে এ সম্প্রদায়ের মানুষরা ভালো ভাবে জীবন যাপন করতে পারবেন বলে এমনটাই আশা করেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ।
