আটিগ্রামে ১৫ দিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মা বুড়ি মেলা শুরু

mela--madhya-pradeshডেস্ক রিপোর্ট:  শনিবার  ১৪ জানুয়ারী থেকে পৌষ সংক্রান্ত উপলক্ষ্যে শুরু হচ্ছে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী মা বুড়ির মেলা। এই উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রামে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী মা বুড়ির (বনদূর্গা) মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মেলা উপলক্ষে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, বলাকা সংসদ ও মেলা কমিটি যৌথ ভাবে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহন করেছে। এ কর্মসূচীর মধ্যে উদ্বোধনী সভা ছাড়াও রয়েছে ১৫ দিন ব্যাপী পৌষ মেলা, আলোচনাসভা ,সার্কাস ,পুতুল নাচ, জারী, সারী, বাউল গানসহ বহু বিনোদন অনুষ্ঠান। পন্ডিতদের মতে হিন্দুদের এই ধর্মীয় উৎসবের মূলে রয়েছে  হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব। ভারত সহ দেশ বিদেশের দুর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য নরনারী এই পৌষ মেলার উৎসবে মিলিত হয়। পৃথিবীর সকল মানুষই আনন্দময় জীবন যাপনে উৎসাহী।  হিন্দুদের রয়েছে পূজা, পার্বন, রথ যাত্রা, সংগীত, মেলা ইত্যাদি। এমনি একটি আনন্দ উৎসব হলো শ্রী শ্রী মা বুড়ির পৌষ মেলা।
আটিগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর-এ-আলম সরকার (নূরু), সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগ নেতা  এবিএম হেলাল উদ্দিন, শেখ আবুল হোসেন, বাবু সুশীল সাহা ও বরুন কুমার সরকার জানান, দীর্ঘ প্রায় ৩ শত বছর পূর্বে থেকেই ঐতিহ্যবাহী মা’বুড়ির মেলা শুরু হয়েছে । বিগত ১৮৯৭ -৯৮ সনে অর্থাৎ প্রায় ১ শতাব্দী পূর্বে মানিকগঞ্জ জেলার বালিয়াটির জমিদার বাবুরা প্রায় এক একর জমি বনদুর্গা পূজা উপলক্ষ্যে দান করেন। দীর্ঘ দিন যাবৎ এই পূজা করছেন স্থানীয় নর্মশুদ্ধ ও ভূই মালিরা।
এই মা বুড়ির মেলায় ৩ দিন মা বুড়ির পূজা অর্থাৎ বনদুর্গা পুজায় নর্মশুদ্ধরা শতকরা ৬০ ভাগ এবং ভূই মালিরা শতকরা ৪০ ভাগ আয়-ব্যায় বহন করে আসছে। এই মেলা উপলক্ষ্যে আটিগ্রাম কাটিগ্রাম, কৃষ্ণপুর, ভগবানপুর, ফারিরচর, নারীকুলী, রাজনগর, বাসাই, কুষাভাংগা, কেষ্টিসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামে দুর দূরান্ত থেকে  আত্মীয় স্বজনরা আসতে শুরু করেছে। এই মেলায় সকল ধর্মের লাখ লাখ মানুষের মিলন স্থলে পরিণত হয়।
এলাকাবাসী জানান, যে সমস্থ আত্মীয় সজন বর্তমানে ভারত  রয়েছে তারা ভারতে কুজ বিহারে মা বুড়ির পুজা অর্থাৎ বনদূর্গা পূজা করে আসছে। বতমান সরকার এই ঐতিহ্যবাহী মা বুড়ির মেলায় মাটির ভিটা কে পাকা করে দেয়ায় অনেকটা সমস্যা সমাধান হলেও এখানে একটি বিল্ডিং নিমার্ণ করা প্রয়োজন। পূর্বের দিনে এই মেলায় ষাড়, ঘোড়া ও উট দৌড় হতো। বর্তমানে আর ষাড় ঘোড়া ও উট দৌড় হচ্ছে না। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অতিথিদের মাধ্যমে মেলা উদ্বোধন করা হচ্ছে ফিতা কেটে ও কবুতর উড়িয়ে। হিন্দু ধর্ম মতে মা বুড়ি হচ্ছে বিনব প্রতি পালক বিষ্ণুর অবতাররা এক সময় দেশে কঠিন রোগ দেখা দিলে স্বপ্নে হিন্দুদের মা বুড়ির পূজা করতে বলেন। হিন্দুরা মা বুড়ির পূজা শুরু করলে দেশের এ কঠিন রোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই ভাবে এই মা বুড়ির পূজা শুরু হয়। পরবর্তীতে শ্রী শ্রী মা বুড়ির পূজাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আটিগ্রামে ঐতিহ্য বাহী শ্রী শ্রী মা বুড়ির মেলা । তাই আজও হাজার হাজার হিন্দু ভক্ত বৃন্দ উপস্থিত হয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠান যথাযোগ্য মর্যাদায় সম্পন্ন করেন। এ সময় বহু মুসলামানও উপস্থিত হয়ে তাদের আনন্দে সাথী হয়। আবার আমৃতি, মিষ্টি আর জিলাপী বিন্নী বাতাসের গন্ধে মেলাঙ্গন হয়ে ওঠে সুগন্ধময়। অপর দিকে নাগর দোলা ও পুতুল নাচের বাজনায় মন আরও আনন্দে মেতে ওঠে এ মেলায়।
এ পৌষ মেলায় হিন্দুদের একটি উৎসব হলেও ধর্মীয় সীমা বদ্ধতা ছাড়িয়ে তা আজ সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আটিগ্রামের এই পৌষ মেলার বৈশিষ্ট হচ্ছে কুটির শিল্পের সমাহার। এখানকার কাঠ নির্মিত দ্রব্যাদি, তামা কাশা, শিল্পের সুনাম বিশ্ব জুড়ে। বড় বড় মাছও এখানে কম বিক্রি হয় না। মেলায় লোক আসে দুর দূরান্ত থেকে। আসে নর-নারী শিশু যুবক বৃদ্ধ সকলেই। কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ই নয় আসে সব সম্প্রদায়ের মানুষ। ছোট বড় ভেদাভেদ ভুলে এ মেলা এক মানব মিলন মেলায় পরিণত হয়। মেলায় মিলে হাজারো জিনিসপত্র।  কাঁসা ও তামা শিল্প আর শিল্পের বিরাট সমাহার। মাছ ও মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের ভীর জমে প্রচন্ড হরেক রকমের খাদ্য সম্ভার দেখা যায় এখানে। চিনির সাজ, বিন্নি মিষ্টান্ন প্রভৃতি। এখানে বসে বিপনী বিতান। এছাড়া এখানে ওঠে কাঠের সমস্থ জিনিস পত্র খেলনা ছুরী তৈজষপত্র শামুক ঝিনুকের গয়না, অস্ত্রের টাটা শব্দ, অসংখ্য মানুষের কলরব সব মিলিয়ে এক তুলকালামকান্ড ঘটে এখানে। সভ্যতা সম্প্রীতির এক মহিমায় দীপ্তিতে উদ্ভাসিত এই মেলা আটিগ্রাম বাসীদের গৌরবাবিত করেছে।
স্থানীয় আটিগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যানকে-সভাপতি ও স্থানীয় বলাকা সংসদের সভাপতিকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রতিবছরই একটি শক্তিশালী মেলা কমিটি গঠন করা হয় । মা বুড়ির ভিটার উপর অর্থাৎ পুজার স্থানের ২/৩ তলা একটি বিন্ডির নির্মাণ করা বিশেষ প্রয়োজন। এ সমস্যা সমাধানসহ ও উন্নয়ন কল্পে মেলা কমিটি স্থানীয় বলাকা সংসদের নেতৃবৃন্দ ও আটিগ্রাম ইউনিয়ন বাসী বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট সুদৃষ্টি কামনা করছেন। এলাকাবাসী দলমত ও ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এ মেলায় একবার ঘুরে এসে আনন্দ উপভোগ করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

 

 

 

মিতু/বিবি নিউজ/১১২৮

Related posts

Leave a Comment