সাভারের বিরুলিয়া দ্বীপে জমিদার বাড়ি দেখতে দশনার্শীদের ভীড়


স্টাফ রিপোর্টার : নীল জশরাশি উত্তাল ঢেউ, চারি দিকে পানি আর পানি, মাঝ খানে একটি গ্রাম,এই বর্ষা মৌসুমে যার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে দ্বিগুণ। বলছি ঢাকার সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের বিরুলিয়া গ্রাম,এই গ্রাম যেন একটি দ্বীপ। বর্ষায় আর শুকনো মৌসুম বিরুলিয়ার রূপ আলাদা। বর্ষায় মিরপুরের দিয়াবাড়ী ঘাট থেকে বিরুলিয়াকে ডিঙি নৌকার মতো মনে হয়। আর শুকনো মৌসুমে এর চারপাশের নিচু জমি সবুজে সয়লাব থাকে। তখন বিরুলিয়াকে মনে হয় যেন কোনো মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড। হারিয়ে যাওয়া শতবর্ষী প্রাচীন এক জনপদ বিরুলিয়া। চারি দিকে পানি দিয়ে ঘেরা এই গ্রামে বসবাস করেন মাত্র তিন’শ ৮০ টি পরিবার। এই গ্রামে মোট ভোটার সংখ্য প্রায় ১৫ ’শ। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও মুসলমানরা একত্রে এই গ্রামে বসবাস করলেও কোন ঝগড়া বিবাদ নেই কারো মাঝে। সুখে দুখে সবাই একে অপরের পাশে থাকেন। বসবাস নদীর ধারে হলেও ঝর জঞ্জাল জলছাস নিত্যসঙ্গী তবু বাঙালী জীবন ঘরনার চিরন্তন সিগন্ধতা এখানে মাধরী বিলায় অষ্ট প্রহর। দ্বীপ এই অঞ্চলের এক ঘেয়ামি কেটে গেছে যেমন নদীর ধারে তেমনি এখানকার মানুষরা রঙ ঢেলেছে জন জীবনে। এই দ্বীপ অঞ্চলের পঞ্চাশ ভাগ মানুষের জীবন ছড়িয়ে আছে কৃষি কাজের সাথে। আর পঞ্চাশ ভাগ মানুষ নদীতে মাছ ধরে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই গ্রামটিতে মসজিদ রয়েছে তিনটি,মন্দির রয়েছে তিনটি ও একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। চারি দিকে পানি দিয়ে ঘেরা এই গ্রামে বিভিন্ন বাড়িতে ডাকাতি ও চুরি রোধে এখানে একটি পুলিশ ক্যাম্পও করেছে সরকার। গ্রামটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও রান্না করার জন্য গ্যাস সংযোগ নেই তাই রান্নার জন্য মাটির চুলাই ভরসা। ১২/১৩টি জমিদার বাড়ি গুলো দেখতে এখানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার এসে প্রতিনিয়ত ভীড় করেন অনেক দশনার্থী।

স্থানীয়রা জানায়, একসময় এ জনপদে ভারত স¤্রাট অশোকের ধামরাইয়ের আওতাভুক্ত ছিল। মিরপুর বেড়িবাঁধ ঘেঁষে নদীপাড় এলাকা বিরুলিয়া। তুরাগ নদীর অংশ বিশেষ নৌকায় পার হলেই বিরুলিয়া। জলাশয় পার হলেই চোখে পড়বে শতবর্ষ পুরনো এক বটবৃক্ষ ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি।

মন্দিরলাগোয়া বণিকবাড়ি, তিনতলা, নকশাবহুল, ঝুল বারান্দা। জমিদার রজনীকান্তের আবাসঘর। ইট বিছানো চিকন রাস্তা, সারা বাড়ি গাছে ছাওয়া। বাড়ির দেয়াল ফুল, পাখি, লতা, সাপের চিনি টিকরির নকশায় সজ্জিত। প্রমাণ সাইজের মোটা মোটা কাঠের দরজা। একটু পা চালিয়ে ছাদে উঠে গেলে প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়া সৌন্দর্য চোখে পড়ে। বাড়ির দেয়ালের গায়ে কোথাও কোথাও শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ খোদাই করা। বাড়ির বাসিন্দারা জানায় আগে বাড়িতে ঢাল, তলোয়ার ও জমিদারদের ব্যবহারের নানা জিনিস ছিল, এসব চুরি হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ১৪-১৫টি নকশাবহুল শতবর্ষী ভবন ছিল একসময় বিরুলিয়ায়, এখন ধুঁকে ধুঁকে ১০-১২ টির মতো টিকে আছে। একসময় এখানে বসবাস করতেন তারকচন্দ্র সাহা, গোপিবাবু, নিতাইবাবু, রজনী ঘোষ প্রমুখ ব্যবসায়ী। বংশী, ধলেশ্বরী ও তুরাগপথে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। তারা এখানে বসে নিলাম কিনতেন আর পরিচালনা করতেন জমিদারি। আর এখানেই একসময় বসতি ছিল আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের কর্ণধারের পিতৃপুরুষদের। চমৎকার মাটির, টিনের, আধাপাকা, বিল্ডিংটিতে বসবাস নারায়ণচন্দ্র সাহার। ইট-সুরকির এই বাড়িগুলো অনেক বছর আগের তৈরি। গ্রামের প্রধান রাস্তাটি সরু এবং ইটের সলিং করা। এটি তারকচন্দ্র সাহা সড়ক নামে পরিচিত। একসময় ভাওয়াল রাজার জমিদারির অংশ ছিল বিরুলিয়া। রাজার অস্থায়ী আস্তানা ছিল এখানে। সাভার, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, মিরপুর ও গাবতলী শাসন করতেন এ মোকামে বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বণিকরা বিরুলিয়ায় পসরা নিয়ে আসত। জমিদারের নায়েব-মুন্সিরা কেনাবেচা নিয়ে রাত-দিন ব্যস্ত থাকতেন। কাজ-কর্মে সরব ছিল সে সময়কার বিরুলিয়া। রজনীকান্ত ছিলেন বিরুলিয়ার বিখ্যাত জমিদার। সুরম্য বাড়ি তার। প্রতি বৈশাখী ও দুর্গাপূজায় দশমী মেলা বসাতেন নিজ বাড়ির আঙিনায়। খোঁজ করলে তার বংশধর জনাকতকের সন্ধান মিলবে। আর মিলবে পৌরানিক কাহিনীর বংশধর বিনোদ বিহারী, ভূপেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ, শিবুচন্দ্র ঘোষ ও গৌরাঙ্গ চন্দ্র ঘোষের। এই গ্রামে এখনো রয়েছে শত বছরের মাটির ঘর। এদিকে এখন জমিদার বাড়ি গুলো ঝুকিপূর্ণ দেখা দিয়েছে। জমিদার বাড়ি গুলো রক্ষনা বেক্ষনের জন্য নানা পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম। সূত্রঃ- সাভার প্রতিনিধি ।

Related posts

Leave a Comment