০৯ জুন ২০২১(বিবিনিউজ ডেস্ক):মহামারির সময় দুটি জিনিসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার খুবই অবহেলা করেছে। এক, জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে খুব বড় ভূমিকা আছে, সেটা উপেক্ষা করা। সরকারি সমর্থক ও তাদের সমমনা অর্থনীতিবিদেরা বলে গেছেন, এসব নিয়ে এখন চিন্তার কারণ নেই। মানুষের টাকা হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা-সব হবে। তবে এ ধারণার মধ্যে চিন্তার অভাব অত্যন্ত প্রকট। কারণ এ নীতিতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে কেবল দুর্দশার মধ্যে পড়েন তা নয়, বরং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বড় সমস্যা হলে আমাদের তা মোকাবিলা করার ক্ষমতাও একেবারে কমে যায়।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।
অমর্ত্য সেন বলেন, স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষ আলোচনা করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসে। কোনো সমস্যা হলে কী করা যায়, সে বিষয়ে ফলপ্রসূ চিন্তা করা যায়। ভারতের যেসব অঞ্চলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো-যেমন কেরালা-সেখানে এটা দেখা যায়। একটি ঘটনা দিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেন অমর্ত্য সেন।
তিনি বলেন, ‘একবার ইন্ডিয়ান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠক হচ্ছিল কেরালায়। আমি ছিলাম বোধ হয় কোভালমে। সেখান থেকে গাড়ি করে যখন যাচ্ছি, আমার একটু কাশি ও শারীরিক যাতনা হচ্ছিল। এর জন্য কিছু ওষুধ কিনতে হলো। ওষুধ পাওয়া গেল একটি মুদির দোকানে। দোকানদার জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধটা নিলাম, তাতে আমার কোনো অ্যালার্জি আছে কি না, সেটা কি আমি জানি? এর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যায়, তাঁদের মধ্যে অসুখ-বিসুখ, ওষুধ ও অসুখ প্রতিরোধের মতো বিষয়ে আলোচনা হয়। সেটার খুবই দরকার, বিশেষ করে এমন মহামারির সময়। লোককে সবকিছু বেটে খাইয়ে দিতে হবে এমন না, তাঁরা নিজেরাও যাতে অনেকটা ভাবতে পারেন, সেটা দরকারি।’
অমর্ত্য সেন বলেন, যাঁরা অবস্থাপন্ন, শুধু তাঁদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হলে এবং অন্যদের অবহেলা করা হলে, অবহেলা করার এই নীতি স্বাভাবিক বলে মনে হয়। যখন চার ঘণ্টার নোটিশে প্রথম লকডাউন করা হলো, তখন ভাবাই হলো না, যাঁদের খেটে খেতে হয়, তাঁরা কোত্থেকে কাজ পাবেন, মজুরি কোত্থেকে পাবেন, তাঁদের খাবারদাবার আসবে কোত্থেকে এবং তাঁরা ওষুধপথ্যই-বা কীভাবে কিনবেন।
ভারতের টিকা কিনতে হচ্ছে-এ কথা শুনে বিদেশিরা অবাক! সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গ উঠলে অমর্ত্য সেন বলেন, এটাতে চিন্তার মারাত্মক গন্ডগোল দেখা যায়। যে রকম অর্থনীতিই হোক না কেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে তো বলা হবেই যে এই জিনিসগুলো সবাইকে বিনা মূল্যে দেওয়া হোক। এমনকি রক্ষণশীল অর্থনীতিতেও এটা পরিষ্কার, যে জিনিসগুলোর ব্যবহারে শুধু নিজের নয়, অন্যদেরও উপকার হয়, সেগুলো বিনা মূল্যে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি জোরালো। টিকা এর খুব ভালো দৃষ্টান্ত, কারণ যিনি টিকা নিচ্ছেন, তাঁর কিছুটা উপকার নিশ্চয়ই হচ্ছে। কিন্তু আরও বড় কথা হলো, এটি ছাড়া এখন সমাজের সবাইকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র খুব সমাজতান্ত্রিক দেশ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের কাছেও এটা খুবই স্পষ্ট যে টিকা বিনা পয়সায় দেওয়া দরকার।
বিপর্যয়ের মধ্যেই ভারতসহ নানা দেশে আর্থিক বৈষম্য বাড়ছে। অথচ মহামারির অভিজ্ঞতা বলছে, এভাবে চলতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থকে সবার আগে রেখে নীতি প্রণয়ন জরুরি। বিপর্যয়ের ধাক্কায় কি সেই পরিবর্তন আসতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে অমর্ত্য সেন বলেন, উত্তরে এইটুকু বলা যায় যে সমস্যা সমাধানের নতুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে সামাজিক উন্নতি ঘটানো তখনই সম্ভব, যখন দেশের সব মানুষকে তার মধ্যে আনার চেষ্টা হয়।
যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে ভীষণ খাদ্যাভাবের ভয় দেখা দিয়েছিল। দেশের সরকার এ নিয়ে খুবই চিন্তিত হলো-তারা এমন একটা অবস্থা চায়নি, যেখানে কিছু লোক না খেতে পেয়ে মারা যাবেন বা অসুস্থ হবেন। ওই সময়ে ভারতে অবশ্য সেটাই ঘটছিল-বেঙ্গল দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ লোক মারা গেলেন। ইংরেজরা ভারতবর্ষকে বাঁচাতে কিছু না করলেও নিজেদের দেশে তাঁরা ঠিক করলেন যে যুদ্ধের সময় রেশনিং চলবে, কন্ট্রোল চলবে। রেশনিং ও কন্ট্রোল ভারতেও চালু হয়েছিল, কিন্তু সেটা শুধু যাতে যুদ্ধের সময় কলকাতায় অশান্তি না হয় তার জন্য। ফলে, রেশন কার্ড পাওয়ার অধিকার ছিল শুধু কলকাতার মানুষদের।
তাঁদের খুব কম দামে খাবার দিতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার ঠিক করলেন, গ্রামাঞ্চল থেকে, যতই দাম পড়ুক, খাবার কিনে ভর্তুকি দিয়ে সস্তায় কলকাতায় খাবার দিতে হবে। তার ফলে কলকাতার লোকেরা খাদ্যের ব্যাপারে আগের থেকে বেশি নিরাপত্তা পেলেন, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে চালের দাম অত্যন্ত বেড়ে গেল, যাঁদের রোজগার ততটা বাড়েনি বা একেবারেই বাড়েনি, তাঁরা মারা পড়লেন।
এতে বোঝা যায়, খাদ্যাভাবের কারণে যে সমস্যা আসতে পারত, তা এড়িয়ে অন্য ব্যবস্থার চেষ্টা করা হলো। এতে মানুষের খুব উপকার হলো। অমর্ত্য সেন বলেন, তাঁরা আবিষ্কার করলেন যে রাষ্ট্রের একটা বড় ভূমিকা দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকারি যে ব্যবস্থা তৈরি হলো-সেটা আজও পাকা, এনএইচএস তো এখনো চলছে-যুদ্ধের আগে তা একেবারেই ছিল না। নতুন সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আগের সমস্যাগুলোরও অনেকটা সুরাহা হলো। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল এ কারণেই যে সরকার যাঁরা চালাচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সমতামুখী চিন্তা জোরদার ছিল। তাঁরা অনেকেই মেনে নিলেন যে সমস্যার সমাধানে সামাজিক ব্যবস্থার বড় ভূমিকা আছে। এ নিয়ে ইউরোপে অনেক দিন আলোচনা হয়েছে।
কার্ল মার্ক্সের প্রসঙ্গ টেনে আনেন অমর্ত্য সেন। বলেন, মার্ক্স তাঁর শেষ লেখা, ‘ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম’-এ বলছেন, সবার জন্য সমতার ব্যবস্থা এখনই করা যাবে না, সেটা করতে হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু গোথা কর্মসূচিতে যে বলা হয়েছিল, মানুষকে উৎপাদনশীলতা অনুযায়ী টাকা দিলে আর কিছু ভাবার দরকার নেই-মার্ক্স বললেন যে সেটা ভুল। তাঁর মত ছিল, ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী নেওয়া আর প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া’-এই নীতি এখনই কার্যকর করে ফেলা সম্ভব না হলেও সে লক্ষ্যে এগোনোর জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এই চিন্তাগুলো ইউরোপের মানুষের মাথায় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁরা ভাবলেন, এখন রাষ্ট্রের সাহায্যে, সামাজিক সুব্যবস্থার সাহায্যে, সমতার দিকে নজর রেখে এগোনোর একটা চেষ্টা করা যায়। ইংল্যান্ডে ও ইউরোপের অন্য নানা দেশে যুদ্ধের পরে সামাজিক ব্যবস্থায় বড় রকম পরিবর্তন এল। সমস্যাগুলো সমাধানের যে প্রচেষ্টা হয়েছিল-অসমতাকে বাড়তে না দিয়ে বরং কমানোর প্রচেষ্টা এবং সমাজের সাহায্য নিয়ে ব্যক্তিগত অর্থনীতির ঘাটতি পূরণ করার প্রচেষ্টা-এই পরিবর্তনে সেগুলোর বড় ভূমিকা ছিল।
ভারতের তাহলে সমস্যাটা কী, এ প্রশ্নে জবাবে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘আমাদের সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু এসেছে দারিদ্র্য থেকে, কিছু এসেছে অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব থেকে, আর কিছু এসেছে চিন্তার বিভ্রান্তি থেকে। এ ক্ষেত্রে আমরা বড় রকম চিন্তার বিভ্রান্তি দেখতে পাচ্ছি। একটু চিন্তা করলেই লোকের এটা বোঝা উচিত যে এ সমস্যা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি যুক্তির আলস্য থেকে।’
