১৬ জুলাই ২০২৬ (বিবিনিউজ) : পিছিয়ে থেকেও লটারো মার্টিনেজের ৯২ মিনিটের গোলে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষায় আছে ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার পথে বেশ ভালভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল ইংল্যান্ড। এন্থনি গর্ডনের ৫৫ মিনিটের গোলে আটালান্টার ৬৮ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ইংল্যান্ড শিবির উল্লাসে ফেটে পড়ে।
এই দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা বিশ্বকাপের মঞ্চে বেশ কিছু স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দিয়েছে। আর এবারও সেই তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি অবিস্মরণীয় লড়াই। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার দুটি বিধ্বংসী আঘাতে স্বপ্নভঙ্গ হলো ইংল্যান্ডের।
ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে লিওনেল মেসির পাস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরান। এরপর যখন ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়, তখন যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে বদলি খেলোয়াড় লটারো মার্টিনেজ হেডে জয়সূচক গোলটি করেন।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরম্যান্সের সঙ্গে হয়তো এই ম্যাচের তুলনা চলে না, কিন্তু এবারও আর্জেন্টিনা যেন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এলো এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল।
১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি। মেসি ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব অর্জন করলেন।
আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল। ৪৮ দলের এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ লড়াইয়ো মুখোমুখি হবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
৩৯ বছর বয়সে এসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। এবার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথমবারের মতো তার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা উপহার দেবার পর অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল মেসির ক্যারিয়ার শেষের পথে। কিন্তু তিনি যে এখনও শেষ হযয় যাননি, সেটিই আবারও প্রমাণ করলেন।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। শনিবার মিয়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। বিশ্বকাপে এটি এমন একটি ম্যাচ, যা কোনো দলই খেলতে চায় না।
৬০ বছর আগে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথমবারের মতো আবারও ফাইনালে ওঠার হাতছানি ছিল ইংল্যান্ডের সামনে। তারা খুব কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু অ্যান্থনি গর্ডনের গোলের পর অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ার মূল্য চুকাতে হলো।
এই টুর্নামেন্টে থমাস টাচেলের দলের ভরসা ছিলেন জুড বেলিংহাম ও অধিনায়ক হ্যারি কেন। কিন্তু এই ম্যাচে দুজনের কেউই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। শেষ বাঁশি বাজতেই হতাশায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতার কারণে শুরু থেকেই এই ম্যাচে উত্তেজনার আবহ ছিল। মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে সেই চাপা টানটান উত্তেজনা স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছিল।
বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্পের পাশাপাশি এই ম্যাচের ঐতিহাসিক গুরুত্বও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের প্রবলভাবে উজ্জীবিত করেছিল। ফলে প্রথমার্ধ জুড়ে দুই দলই বেশ কিছু ফাউল করেছে। এমনই এক মুহূর্তে লিওনেল মেসিকে কঠোর ট্যাকলে ফেলে দেওয়ায় এলিয়ট অ্যান্ডারসন হলুদ কার্ড দেখেন। প্রথমার্ধে উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো গোলের সুযোগ তৈরি হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তারই ধারাবাহিকতায় ৫৫তম মিনিটে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। আক্রমণ গড়ে তোলার শুরুতে হ্যারি কেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ডান প্রান্ত থেকে মর্গান রজার্সের নিচু ক্রসে পোস্টের সামনে নাহুয়েল মোলিনাকে ফাঁকি দিয়ে অ্যান্থনি গর্ডন বল জালে পাঠান।
এই একই স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত এক জয় নিশ্চিত করেছিল আর্জেন্টিনা। এবারও তারা হাল ছাড়েনি।
সমতা ফেরাতে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। নিকো গঞ্জালেসের হেড দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর ৭৬তম মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এনজো ফার্নান্দেজের দুরপাল্লার শটও রুখে দেন পিকফোর্ড। কিন্তু অল্পক্ষণ পরই তিনি আর কিছু করতে পারেননি। বক্সের প্রান্তে মেসির পাস থেকে দুর্দান্ত শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে সমতা ফেরান ফার্নান্দেজ।
ম্যাচে ফিরে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা আরও বেশী আক্রমনাত্মক হয়ে উঠে। ম্যাক অ্যালিস্টারের আরেকটি প্রচেষ্টা আবারও পোস্টে লাগে। এরপর ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে মেসির অসাধারণ ক্রস থেকে লটারো মার্টিনেজ হেডে দলের জয় নিশ্চিত করেন।
