শিশুর যুগোপযোগী শিখনে প্রাথমিক বিদ্যালয়

জোহরা খাতুন,০৬ নভেম্বর, ২০২০(বিবিনিউজ):’সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শুদ্ধাচার ও নৈতিকতা শিক্ষার একটি সঁতিকাগার হিসেবে তৈরি করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে এমনকি সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলিতেও শুদ্ধাচার ও নৈতিকতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যার অভীষ্ঠ লক্ষ্য হচ্ছে সুদূর প্রসারী, আর ফলাফলও হবে সুমিষ্ট। এর ফলে দেশের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি হবে দেশের দক্ষ মানবসম্পদে। থাকবে না দেশে কোনো ধর্ষক, তৈরি হবে না কোনো মাদকসেবী, জড়িয়ে পড়বে না কোনো অনৈতিক পরকীয়া প্রেমে। এগুলোর সবই হচ্ছে পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি, নৈতিক শিক্ষার চরম অবহেলা, বাবা-মার সুশাসনের অভাব, বয়োঃজেষ্ঠ্য/মুরব্বিদের শ্রদ্ধা না করার ফলাফল। পরিবার ছাড়ার পর বিদ্যালয় হচ্ছে শিশুর প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে তার সামাজিকীকরণ ঘটে। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে শিশুশ্রেণি থেকেই মিথ্যা বলা পরিহার করা, কটুকথা পরিহার করা, অন্যের জিনিস না বলে নিয়ে যাওয়া, পরের কোনো কিছু দেখে লোভ না করা, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি চর্চা করা হয়। কেননা শিশু শ্রেণিই হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার প্রবেশদ্বার।

বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে তৎপর। শিশুদের শিক্ষার পথ সুগম করার জন্যে সরকার সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বরাদ্দ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে তিনি করেছেন অবৈতনিক। শুধু তাই নয়, মেধাবৃত্তি, উপবৃত্তিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা সেখানে রেখেছেন। তাই শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলছি,  ‘Manage your time/Manage your priority/Manage your focus&_.

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সার্বিক সহায়তায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে রয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারবৃন্দ, জেলা পর্যায়ে রয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে রয়েছেন রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর, জেলা পর্যায়ে রয়েছেন পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি শিক্ষকই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং অভিজ্ঞ, পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা তাদের খুবই গভীর ও সমৃদ্ধ। সারা বছরই তাদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে পেশাগতভাবে দক্ষ করে তোলা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে ‘উপজেলা রিসোর্স সেন্টার’ নামক একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার। যারা বছরব্যাপী নিরলসভাবে অধীর আগ্রহসহকারে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি কারিগরিভাবে দক্ষ করে তোলার কাজে নিবেদিত। সেখানে অফিস প্রধান হিসেবে আছেন একজন পেশাগতভাবে দক্ষ এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিকভাবে সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ‘ইন্সট্রাক্টর’। যাঁর পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা এবং মূল্যবোধ বেশ ইতিবাচক। গভীর ও সমৃদ্ধ। কেননা একজন শিক্ষকের জীবনে প্রশিক্ষণ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা বিভিন্ন বেসরকারি এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই দেখি প্রশিক্ষণ সেখানে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রশিক্ষণ নিয়ে তর্ক-বির্তকের অভাব নেই। একজন যোগ্য ও আদর্শ প্রশিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সার্বক্ষণিক ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখার চেষ্টা করা। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘টারমিনেটর’-এর নায়ক ও ক্যালির্ফোনিয়ার দুবার নির্বাচিত গর্ভনর আর্নল্ড শোয়ারর্জেনেগার বলেছেন, ‘প্রশিক্ষণ আমাদের কাজের চাপ থেকে সৃষ্ট জীবনীশক্তি দমনকারী বিষয়গুলোকে বর্হিগমনের পথ দেখায়’। আমেরিকার একজন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও লেখক রবার্ট কিয়োসাকি বলেছেন, ‘নিয়মানুবর্তিতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠে।’ উক্তিগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, একজন শিক্ষকের জীবনে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষার্থীর সাথে একজন শিক্ষকের ব্যবহার, আচরণ সকল কিছুরই পরিবর্তন ঘটে একমাত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। কেননা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক পৃথিবীর সেরা সম্পর্কের একটি। শিক্ষককে তার মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে শিক্ষার্থীর মেজাজ বুঝে তার প্রতিভাকে জাগ্রত করে তার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ সৃষ্টি করেন, মানুষ গড়ার কারিগর জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানগুলো। সুতরাং শিক্ষকের সম্মান সবসময় সবার ঊধর্্েব। পূর্বেও ছিলো, এখনও আছে। প্রধান শিক্ষক হচ্ছেন বিদ্যালয়ের প্রাণ ও কেন্দ্রবিন্দু।

একমাত্র মানুষকেই দুবার জন্মগ্রহণ করতে হয়। একবার তার মাতৃগর্ভে, আরেকবার শিক্ষকের শাসনে-সোহাগে শিক্ষার্থীর জন্ম হয় বিদ্যালয়ে। তাই মাতৃকোল ছাড়ার পর বিদ্যালয় হচ্ছে শিশুর প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে শিশুর সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তার সামাজীকিকরণ ঘটে। আজকের দিনে সুশিক্ষার অভাবেই বর্তমান সমাজের অধপতন, নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটছে। শুধু শিক্ষকগণই এখানে একচেটিয়া দায়ী নয়, পারিবারিক শিক্ষা এক্ষেত্রে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে।

একটি সুসংগঠিত সমাজে একদিনে একজন ধর্ষক, মাদকসেবী, পরকীয়া প্রেমিক তৈরি হয়নি। ভঙ্গুর পরিবার তথা অতিআধুনিকতার খোলসের ভেতরেই এদের জন্ম। মুখে অত্যন্ত সৎ ও কঠিন বুলি আওরায়, কিন্তু অন্তরে মনে-প্রাণে এরা ধর্ষক, কামলোভী। অংশ/খ-চিত্র দেখে কখনোই সমগ্রকে উপলব্ধি করা যায় না। সামাজিক অবক্ষয়ের খ-চিত্র দেখে, সামগ্রিকতা বিশ্লেষণ ও অনুধাবন না করতে পারলে সমস্যা আরো জটিল হবে, সমাধান হবে দুরূহ, প্রতিকার ও প্রতিরোধের পদক্ষেপ হবে ত্রুটিপূর্ণ। সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালে আজকের এই ঘুঁনে ধরা সমাজের অবক্ষয় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই মূল্যবোধ এবং আচরণের ইতিবাচক ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষকের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার জন্যে প্রতিটি উপজেলায় ‘উপজেলা রিসোর্স সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এতে শিক্ষকগণ যে কোনো তথ্য, প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, সুযোগ-সুবিধা সকল কিছু হাতের নাগালে পাচ্ছে। একজন শিক্ষক পূর্বে সারা জীবনে মাত্র একবার প্রশিক্ষণ পেতো, যেটাতে ‘পিটি ট্রেনিং’ বলা হতো। এখন সারাবছর একজন শিক্ষক কোনো না কোনো প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন। আইসিটি প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী সকল ধরনের প্রশিক্ষণ উপজেলা রিসোর্স সেন্টার থেকে পেয়ে থাকেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়েই গড়ে উঠেছে আজকের উপজেলা রিসোর্স সেন্টার। করোনাকালে শিক্ষকদের ভার্চুয়াল প্লাটর্ফমে অনলাইন ক্লাস নেয়ার এই কঠিন কাজটির সম্পাদনে নিবেদিত হয়ে সার্বিক সহায়তা প্রদান করে আসছে উপজেলা রিসোর্স সেন্টার। কেননা একজন শিক্ষককে শুধু চধফধমড়মরপধষ জ্ঞান থাকলেই হবে না, তাঁর টেকনিক্যাল জ্ঞানও পর্যাপ্ত না থাকলে তার কাছ থেকে ভালো পাঠদান আশা করা যায় না। এটা এখন বর্তমান সময়ের দাবি। একজন উপজেলা রিসোর্স সেন্টার ইন্সট্রাক্টর শুধু পেশাগত জ্ঞান ও পেশাগত মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নয়, ওঈঞ রহ ঊফঁপধঃরড়হ ঢ়বফধমড়মরপধষ এ দক্ষ ও অভিজ্ঞ । যদিও প্রাথমিক শিক্ষায় ইউআরসি ইন্সট্রাক্টরগণ এখনো পদোন্নতিবঞ্চিত। তাছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনেকগুলো ক্যাডার পদ থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষায় মাঠ পর্যায়ে কোনো ক্যাডার পদ নেই। প্রাথমিক শিক্ষার মানউন্নয়নে ক্যাডার পদ এখন সময়ের দাবি।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকই হবেন উদার, মানসিকতার, শুদ্ধাচারের এক মূর্তপ্রতীক। যার কাছ থেকে সকল নৈতিকতা, বিনয়ী ব্যবহার, আচরণে শুদ্ধতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষক হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ রোলমডেল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের জন্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশে রয়েছে নানা অয়োজন। বাংলাদেশ কোনো অংশে এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তার শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এটাই স্বীকৃত ও কাঙ্খিত। এই সংক্রান্ত সকল আয়োজন হবে বিদ্যালয় কমিউনিটিতে শিক্ষককেন্দ্রিক। যা শিক্ষকরা নিজেদের উন্নয়নে নিজেরাই সহায়ক ও সমর্থক হবে। যেমন লেসন স্টাডি। বিশেষ ক্ষেত্রভেদে বিদ্যালয় অন্য কমিউনিটি/ক্লাস্টার/উপজেলা পর্যায় হতে রিসোর্স পার্সন এনে নিজেদের প্রশিক্ষিত করতে পারে। এই প্রশিক্ষিত শিক্ষকগণই হচ্ছেন দ্বিতীয় মা। তাই তো প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। Mother is the first teacher/Teacher is the Second Mother.

শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, পরিবার, সুশীল সমাজ, সচেতন অভিভাবক, এলাকার জনপ্রতিনিধি সকলকে শিক্ষার একটি মেইনস্ট্রীমে আসতে হবে। যাতে সকলেই তাদের সন্তানকে, পরবর্তী প্রজন্মকে, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার জন্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং অন্যকে উদ্বুদ্ধ করে। প্রত্যেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আলোকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং মূল্যায়ন করা হয়। যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের জন্যে প্রতিবছর উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষত করে তোলা হয়।

Related posts

Leave a Comment