বাজারে এখন ইলিশের দাপট। ঝকঝকে সুস্বাদু এসব রুপালি ইলিশ ভোজন রসিক ক্রেতার নজর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। দামে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতারা যেমন ইচ্ছেমতো ব্যাগে ভরছেন, বিক্রেতারাও দেখছেন লাভের মুখ। সেইসাথে যেসব জেলেরা উত্তাল সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইলিশ ধরছেন, তাদের মুখেও হাসি ফুটিয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ।
মত্স্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি থেকে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও এবার সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালি ইলিশ ভুলিয়ে দিচ্ছে জেলেদের কষ্ট।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বঙ্গোপসাগরের মাছের জন্য মত্স্য বন্দর মহিপুর ও আলীপুরে ছুটে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে এখন প্রায় প্রতিদিনই হাঁকডাকে মুখর থাকে মহিপুর ও আলীপুরের আড়তপট্টি। আড়তগুলোতে ইলিশের আমদানি পর্যাপ্ত, দামও কম। খোলা ডাকে বিক্রি হচ্ছে এসব ইলিশ। গত বছর কুয়াকাটা, মহীপুর ও আলীপুর থেকে ইলিশ সরবরাহ ছিল ২২ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর তা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আড়তদারদের সূত্রে জানা গেছে, এবার দেড় থেকে দুই কেজি, এমনকি আড়াই কেজি ওজনের ইলিশও ধরা পড়ছে। দামও গত বছরের তুলনায় মণ প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা কম। বর্তমানে আড়তে দেড় থেকে আড়াই কেজি ওজনের ১ মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। ৮শ’ থেকে ১ হাজার গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ ৩২ হাজার টাকা। আর ৬শ’ থেকে ৮শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ১৮ হাজার টাকা। ৫০০ গ্রাম বা এর কম ওজনের প্রতি মণ ইলিশের দাম ১৩ হাজার টাকা।
শুক্রবার রাজধানীর কাওরানবাজার ও নিউমার্কেটসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে ৫শ’ থেকে ৬শ’ গ্রাম ওজনের এক হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। তবে ১ কেজি বার তারচেয়ে বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ টাকায়।
কাওরানবাজারে বাজার করতে আসা নেয়ামুল করিম বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশ। বড়-ছোট সব সাইজের ইলিশই আছে। তবে ছোট আকারের ইলিশের দাম তুলনামূলক সস্তা হলেও বড় ইলিশের দাম বেশি। তারপরও এবার ইলিশ কিনে সবাই খুশি। তিনি বলেন, সাড়ে ৪শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ কিনেছি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজিতে। এরচেয়ে সস্তা এর আগে কখনো কিনতে পারিনি।
এ বাজারের ইলিশ বিক্রেতা হাবিবুর বলেন, এবার ইলিশের আমদানি প্রচুর। তবে বড় আকারের চেয়ে ছোট ইলিশের আমদানি বেশি। যে কারণে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় ইলিশের দাম কমেনি। তবে এবার সস্তায় ইলিশ কিনে ক্রেতারা যেমন খুশি আমরাও খুশি। গত বছরের তুলনায় এবার মোকামেও ইলিশের দাম কম ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার জাটকা নিধন বন্ধে যেভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে তাতে আগামিতে বাজারে ইলিশের সবরবরাহ আরো বাড়বে।
মত্স্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ইলিশ রক্ষায় সরকারের নানা উদ্যেগের ফলে প্রতি বছরই ইলিশের উত্পাদন বাড়ছে। জাটকা নিধন বন্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি মা ইলিশ রক্ষায় নানা উদ্যেগ, ইলিশের অভয়ারণ্য নিরাপদ করাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে ইলিশের উত্পাদন বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় ৯৭২ কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দাদনের (ঋণ) জাল ও মহাজনদের হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করার পাশাপাশি জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়ানো, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, মত্স্য সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হবে।
