স্টাফ রিপোর্টার,৩০ জুন ২০২২(বিবিনিউজ ): এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা ভয়াবহ করোনার ভাইরাসের কারনে ২ বছর বন্ধ থাকার পর ঢাকার ধামরাইয়ে যশোমাধবের ৪ শত বছরের পুরোনো রথযাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী কাল শক্রবার পহেলা জুলাই। এ উপলক্ষ্যে ধামরাই ও সাভারের রথযাত্রা উৎসবসহ বসছে মাস ব্যাপী রথমেলা। তবে, রথটান ও রথমেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে মন্দিরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনসহ রথটান অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে রথযাত্রা উৎযাপন কমিটি ও স্থানীয় প্রাশাসন।
রথের রং তুলিসহ সকল কাজ ইতো মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে । ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার জানান, এবার রথযত্রায় পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি থাকবে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারী ।
রথযাত্রা উৎযাপন কমিটি যুগ্মসাধারন সম্পাদক বাবু নন্দ গোপাল সেন জানান, ধামরাইয়ে এবার রথযাত্রা এবং রথমেলাকে ঘিরে থাকছে দুই শতাধিক বিভিন্ন প্রকারের স্টল সহ মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ সহ নানা অনুষ্ঠান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকি বলেন,স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারের সংসদ সদস্যসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে ধামরাইয়ের রথযাত্রা । আর এই মধ্যে নেওয়া হয়েছে সব ধরনের প্রস্তুতি ।
অপরদিকে সাভারে ভাগলপুরে এবং মধ্যপাড়ায় অনুরুপ ভাবে অনুষ্ঠিত হবে পৃথক পৃথক রথযাত্রার কর্মসুচী।
করোনাভাইরাস মহামারি ও কঠোর লকডাউনের কারণে গত ২ বছরে এশিয়ার মহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকার ধামরাইয়ের যশোমাধবের রথযাত্রা সাভারের কানাই লালের এবং সাভারের দক্ষিন পাড়ায় গোপিনাথ বাবুর রথযাত্রার উৎসবসহ রথমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
রথযাত্রা উৎযাপন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নন্দ গোপাল জানান, এ বছর ১ জুলাই রথটানের মধ্য দিয়ে এবারের রথযাত্রা উৎসব শুরু এবং ৭দিন পর উল্টো রথযাত্রা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী রথ পুড়িয়ে দিলে প্রথম বারের মতো ১৯৭১ সালে রথযাত্রা উৎসব আয়োজন হয়নি। পরে গত ২ বছর করোনার কারনে দ্বিতীয় বারের মতো আয়োজন বন্ধ ছিল। ।
বাংলার গৌরবময় এই সুপ্রাচীন প্রায় চার শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ধামরাই এর রথ ও রথ মেলা উৎসবের গোড়া পত্তন হয়েছিল বাংলা ১০৭৯ সালে।
“বাংলার বরেণ্য পল্লী কবি জসিম উদ্দিন” তৎকালীন পাক সরকারের আমলে রথ উৎসবে বেড়াতে এসে ওই সময়ের বৃহৎ সুউচ্চ রথে চারি পাশ ও আদি অন্ত দেখে ও পরিদর্শন করে বিখ্যাত এক কবিতা লিখে রথের ইউতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। যার নাম “ধামরাই রথ”। ওই কবিতার চয়নে ফুটিয়ে তুলেন ধামরাই রথের প্রকৃত চিত্র ও ইতিহাস ।এমন অনেক স্মৃতিই রয়েছে এই ধামরাই রথের ইসিহাসে।
এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও ধর্মীয় রথ উৎসব ও মাস ব্যাপী মেলা হয়ে আসছে। ধামরাই মাধব মন্দির কমিটির উদ্যোগে রথ উৎসব পালনে রথের যাবতীয় সংস্কার কাজ ও মাসব্যাপী মেলার আয়োজন ও রং তুলির কাজ ইতো মধ্যেই শেষ হয়েছে। এই ঐতিহব্যবাহী রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে গোটা ধামরাইয়ে এখন সাজ সাজ রব পড়ে গেছে ।
এ উৎসব হিন্দু ধর্মীয় ভাবধারায় প্রায় ৪০০ শত বৎসর পূর্ব হতে শুরু হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারনে এই উৎসব ব্যাপক ভাবে সার্বজনীনতা লাভ করেছে। এই ধর্মীয় রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে ও ইতিহাস খ্যাত ধামরাইয়ে বেড়ানোর জন্য প্রতিটি বাস গৃহে দুরদুরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজন এসে ভীড় করে। অতিতে বাংলাদেশ নয় বিদেশ থেকেও হাজারো ভক্তবৃন্দরা রথ উৎসব কে কেন্দ্র করে ধামরাইয়ে এসে ভীড় জমাত। এখনো আসে। পুরো উৎসবটিই কালের বিবর্তনে এখন ধর্মীয় ভাবধারা নয় সার্বজনীন স্রোতধারায় প্রভাবিত হচ্ছে।
ধামরাই মাধব মন্দির ও রথমেলা উৎসব কমিটির সভাপতি জানান,উপ মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধামরাইয়ের এই রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে সাধারন মানুষের মাঝে আবারও করোনা ভাইরাসের ঢেউয়ের মধ্যেও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। রথ মেলাকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। বসবে দেশ খ্যাত সার্কাস দল। পতুল নাচ, মৃত্যু কুপের খেলা নানা ধরনে গ্রামীন খেলা। থাকছে মেলার বিশেষ আকর্ষণ বৃহত্তাকার হাতি।
গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ধারক ও ইতিহাসের আবর্তে ঘেরা ঢাকার অদুরে ধামরাই উপজেলা এক অতি প্রাচীন ঐতিহ্যময় জনপথ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতির এক অপূর্ব ঐতিহ্য রয়েছে এই ধামরাইয়ে। একটি পৌর সভা ১৬টি ইউনিয়নের ৪৩৮টি গ্রাম নিয়ে ধামরাই এর পরিধি বিস্তৃত রয়েছে।
ধামরাই এর চারপাশ ঘেরা বংশী ও কাকিলাজানি নদী বেষ্টিত সবুজের সমাহার ও জনপথ। এক সময় ধামরাই এর যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নৌকা ও নৌপথ। পরিবর্তনশীল জগতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সড়ক ও আট লেনের মহাসড়কসহ আধুনিকায়নের ছোয়ায় গড়ে উঠেছে ধামরাই এর পুরো অঞ্চল। রথযাত্রা নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রথের দিন বিকেলে মাধব মন্দির থেকে মাধব বিগ্রহসহ অন্য বিগ্রহ গুলো নিয়ে রথের ওপর মূর্তিগুলো স্থাপন করে নেয়া হবে যাত্রা বাড়ী মন্দিরে।
বিগত দিনে এই রথটি মূর্তি সমেত লাখো ভক্ত নর-নারী পাটের রশি ধরে টেনে নিয়ে যেত পৌর এলাকার যাত্রাবাড়ীর গোপনগর মন্দিরে। এখানেই রথটি প্রতি বছরের ন্যায় ৭ দিন অবস্থান করবে.মাধব ও অন্যান্য বিগ্রহগুলি রথ থেকে নামিয়ে নিয়ে ৭ দিন পূজারীদের দ্বারা পুজিত হতো কথিত মাধবের শ্বশুরালয় যাত্রাবাড়ি মন্দিরে। ৭ দিন পর অনুষ্ঠিত হবে উল্টো রথযাত্রার সংক্ষিপ্ত উৎসব। পূর্বের ন্যায় মাধব ও তার সহচরদের বিকালে আনবে পূর্বের স্থান থেকে মূর্তি গুলি চলে যাবে পুরোনো মাধবের নিজ আলয় মন্দিরে। যেখানে রথ খোলায় রথটি সারা বছর থাকে বলে এই স্থানটির নামকরণ হয়েছে রথ খোলা।
এই রথ যাত্রার ইতিহাসও প্রায় ৪০০ বছরের। ১৯৭১ সালে ৯ এপ্রিল স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার ও তাদের দোসররা ৭৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ৪৪ ফুট পাশে মুল্যবান কাঠের ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় রথ খানা পুড়িয়ে দিয়ে বাংলা ও বাঙালীর উৎসব ও ঐতিহ্য ধ্বংস করে দেয় বলে জানিয়েছেন ধামরাইয়ের সাংসদ বীর মুক্তিযদ্ধা বেনজীর আহমেদ।
ধামরাই থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন,পূর্বের ন্যায় রথ পরিচালনা কমিটির পাশা পাশি পুলিশ, র্যাব মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদা পোশাকে নজরদারি করছেন। তিনি বলেন ইতিমধ্যেই রথ ও মেলা কমিটির নের্তৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময়ও সভা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ধামরাই রথ কমিটির অন্যতম সদস্য ও শিল্পী সুকান্ত বনিক বলেন- বিগত ২০০৬ সালে ধামরাইয়ের রথ উৎসবে তৎকালীন মাধব মন্দির কমিটির সাধরন সম্পাদক ধামরাইয়ের বিশিষ্ঠ সমাজ সেবক প্রয়াত ঠাকুর গোপাল বনিকের আমন্ত্রনে রথ উৎসবে বিশেষ অতিথি হয়ে আসেন ঐ সময়ের বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের দূত শ্রীমতি বিনা সিক্রী। ধামরাই বাসীর আন্তরিক দাবীর প্রেক্ষিতে শ্রীমতি বিনা সিক্রী তার ভাষণে পূর্বের আদলে ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়া রথটির আদলেই ধামরাইয়ের রথটি নির্মান করে দেবার আশ্বাস দেন।
এর পর রথ ও মাধব মন্দির কমিটির দুই জন কর্মকর্তা বর্তমান প্রয়াত ঠাকুর গোপাল বণিক ও শিল্পী সুকান্ত বণিক নিজে ধামরাই থেকে ভারতের পুরিতে যান। সেখানেই রথ নির্মান খরচ বিষয়ক তত্বাবধায়ক বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর ভারত সরকার বাংলাদেশের সেতু বন্ধন অটুট রাখতে ধামরাইয়ে রথটির নির্মানে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মানের প্রদক্ষেপ গ্রহন করেন। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের তত্বাবধানে ২০০৯ সালে ধামরাই রথের টেন্ডার হয়। টেন্ডার পেয়ে উই.ডি.সি.কেল.বিন টেকনো.টাচ -ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ২০১০ সালের জানুয়ারী থেকে রথ নিমার্ন করেন। ২০১০ সাল থেকেই ধামরাইয়ে পূর্বের আদলে নতুন রথেই উপমহাদেশ খ্যাত ঐতিহাসিক রথ উৎসব চলছে। আর এই রথ উৎসবে প্রতি বছরই বাংলাদেশস্থ ভারতী দুতাবাসের কর্মকর্তবৃন্দরা অংশ গ্রহন করে আসছেন।
যশোমাধাব মন্দির পরিচালানা ও রথ কমিটির সাধারন সম্পাদক,কুমুদিনি ওয়েল ফেয়ার ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান ও আর পি সাহার নাতি রাজিব প্রসাদ সাহা ।
অনুরুপ ভাবে সাভারের কাতলাপুরে কানাইলাল ও দক্ষিন পাড়ার গোপিনাথ বাবুর রথ যাত্রা উৎসবেরও প্রস্তুতি সম্পন্ন।
এ রথমেলা উৎসব সর্বদলীয় উৎসব। তাই সকল দলের মানুষই আশা করছেন মহান সৃষ্টিকর্তা যেন এ মহামারী করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত করে আগামীতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ উৎসব পালনের সুযোগ করে দিবেন এমনটি প্রত্যাশা সকলের ।
