২৮ অক্টোবর, ২০২৬ (বিবিনিউজ): চীনে এমবডিড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রোবট প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি ও পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
চীনের ছোংছিং থেকে সিনহুয়া জানায়, গত সেপ্টেম্বরে চীনের মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সরকারি বিভাগ এমবডিড এআই রোবট অ্যাপ্লিকেশন টেকনিশিয়ান এবং ডিজিটাল টুইন প্রকৌশলীসহ ১১টি নতুন পেশার স্বীকৃতি দিয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ছোংছিং পৌরসভার লিয়াংজিয়াং নিউ এরিয়ায় অবস্থিত সেভেন্স রোবোটিকসে ট্যাং জিশিয়াং এমবডিড এআই রোবট অ্যাপ্লিকেশন টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন। তার দায়িত্ব রোবটকে বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
ট্যাং বিভিন্ন কর্মপরিস্থিতির অনুকরণ করতে নবের অবস্থান ও কোণ পরিবর্তন করেন এবং এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেন। এরপর প্রশিক্ষিত মডেলগুলো রোবোটিক বাহুতে স্থাপন করে আরও পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা হয়।
বারবার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে রোবটগুলো বাস্তব পরিবেশে কাজ করার আগে সিমুলেশনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কাজ শিখে নেয়।
ট্যাং বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো রোবটকে পরীক্ষাগার থেকে বের করে বাস্তব জগতের নানা ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা।’
সেভেন্স রোবোটিকস তেল, রাসায়নিক ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য বিশেষায়িত রোবট তৈরি করে। এসব রোবট ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে মানুষের পরিদর্শনকাজের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে অথবা মানুষকে সহায়তা করতে পারে।
এ ধরনের পরিবেশে রোবটকে দীর্ঘ সময় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে হয়। ট্যাং বলেন, প্রযুক্তিবিদদের রোবটের গতি ও নির্ভুলতার মান নির্ধারণ করতে হয়, ব্যর্থতার পর রোবট কাজ পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না তা পরীক্ষা করতে হয় এবং কোন পরিস্থিতিতে রোবটের কাজ থামানো বা মানুষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো পরীক্ষাগারে কাজ করা রোবটকে এমন যন্ত্রে রূপান্তর করা, যা দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে।’
নতুন স্বীকৃতি পাওয়া আরেকটি পেশা ডিজিটাল টুইন প্রকৌশলও বাস্তবে ব্যবহারের আগে রোবটকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করছে।
এ পেশায় কর্মরত জিয়াং লেই এমন ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে পরিদর্শনকারী রোবটগুলো বাস্তব স্থানে মোতায়েনের আগে বিভিন্ন কাজের অনুশীলন করতে পারে।
ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) পুনর্গঠন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জিয়াংয়ের দল কারখানার ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করে। এতে ভার্চুয়াল রোবটগুলো পরিদর্শনের পথ অনুশীলন করতে পারে এবং তাদের ক্যামেরা যন্ত্রপাতির মিটারের পাঠ ধারণ করতে পারছে কি না, তা পরীক্ষা করা যায়। সিমুলেশনে কাজের যথার্থতা যাচাই হয়ে গেলে সেই কাজ বাস্তব রোবটে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।
জিয়াং বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রযুক্তিবিদদের প্রথমে রোবট নিয়ে প্রকল্পস্থলে যেতে হতো। এরপর পরিবেশের মানচিত্র তৈরি, চলাচলের পথ পরিকল্পনা এবং পরিদর্শনের স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হতো।
কিন্তু ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তির মাধ্যমে আগে থেকেই ভার্চুয়াল পরিবেশে এসব কাজের অনুশীলন করা যায়। ফলে প্রকল্পস্থলে রোবট স্থাপন ও চালু করার প্রস্তুতিমূলক সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহ থেকে কমিয়ে দুই থেকে তিন দিনে আনা সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া সিমুলেশনের মাধ্যমে অ্যালগরিদম পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য তৈরি করা যায়। এতে বাস্তব পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের সময় ও ব্যয় কমে।
এমবডিড এআই শিল্পের বিভিন্ন ধাপ ক্রমে বিশেষায়িত হয়ে ওঠায় নানা শিক্ষাগত পটভূমির মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহন প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করা জিয়াং স্বচালিত যানবাহনবিষয়ক গবেষণা থেকে রোবট উন্নয়নের কাজে যুক্ত হয়েছেন। এ কাজে ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি, প্রোগ্রামিং ও সিমুলেশন সম্পর্কে দক্ষতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, এ বছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কম্পিউটারবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করা ট্যাং রোবট প্রশিক্ষণে রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং ও ইমিটেশন লার্নিং পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। একই সঙ্গে তিনি রোবটের গতিবিদ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরও পড়াশোনা করছেন।
শিল্পটির বিকাশের ফলে তথ্য সংগ্রহ, মডেল প্রশিক্ষণ, সিস্টেম চালু করা, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজেও বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে।
চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশটিতে হিউম্যানয়েড রোবটের মডেলের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। এ সময়ে উৎপাদিত হিউম্যানয়েড রোবটের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।
এ খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগও জোরদার হচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে বেইজিং সিটি ইউনিভার্সিটি এমবডিড এআইয়ের প্রয়োগ ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বিষয়ে উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি তৈরির একটি কর্মসূচি চালু করেছে।
এ কর্মসূচিতে শিল্প খাতের কর্মীরা পাঁচ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। এতে শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি বাস্তব রোবট নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
ট্যাং বলেন, তিনি আশা করেন, রোবট মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষের কাজের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, রোবট আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ক্লান্তিকর ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের দায়িত্ব নেবে।’
