বিশেষ প্রতিবেদক,
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের শেষ ফাঁসি হতে পারে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী জামায়াতে ইসলামীর আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর। কেরানীগঞ্জে বন্দি স্থানাস্তরের আগেই তার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। এতে করে সমাপ্তি হবে প্রায় ২’শ বছরের ইতিহাসের। আর এই ইতিহাসের শেষ ফাঁসিও হবে নিজামীর।
জানাগেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্ত্রীয় কারাগারে আনা হয়েছে। রবিবার রাত সাড়ে ১১টার পরে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। গত বৃহস্পতিবার আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
রাষ্টপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সময় শেষ হতে চলেছে নিজামীর। তার ফাঁসির দিন-ক্ষন সরকারীভাবে ঘোষনা না হলেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ধারনা করছেন যে, প্রাণভিক্ষা না চাইলে কেরানীগঞ্জে কারাগার স্থানান্তরের আগেই ফাঁসির রায় কার্যকর করা হতে পারে। যদি তাই হয়, তবে এই ফাঁসির মাধ্যমে অবসান হবে প্রায় ২’শ বছরের একটি অধ্যায়ের।
বন্দিদের কেরানীগঞ্জ নতুন কারাগারে স্থানান্তরের দিন ঠিক হয়ে গেছে। একটানা ৩ দিন বিশেষ নিরাপত্তায় বন্দি স্থানান্তর করা হবে। চলতি মাসের ২০, ২১ ও ২২ তারিখে বন্দিদের নতুন কারাগারে উঠানো হবে বলে আইজি প্রিজন জানিয়েছেন। আসামী স্থানান্তর হয়ে গেলে ঐতিহাসিক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের স্থানে একটি যাদুঘর ও পার্ক নির্মান করা হবে। ইতিহাস হয়েই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিতে যাচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
ইতিহাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার :
২২৮ বছর আগে এখানে ছিল আফগান দূর্গ। মুগল সুবাদার ইব্রাহিম খান ঢাকায় বর্তমান চকবাজারে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে দুর্গটি ঢাকার নায়েব-ই- নাজিমের আবাসস্থল ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে ১৭৮৮ সালে দুর্গের অভ্যন্তরে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত দুর্গটিকে কারাগারে রূপান্তর করা হয়। আঠার শতকের শেষদিকে ঢাকা কারাগারে দশটি ওয়ার্ড ছিল এবং সে সময়ে গড়ে ৫’শ থেকে ৫’শ ৫০ জন বন্দি সেখানে অবস্থান করত। প্রথমদিকে একজন বন্দির খাদ্য সরবরাহ বাবদ দৈনিক বরাদ্দ ছিল দু’ পয়সা। ১৭৯০ সালে তা বাড়িয়ে এক আনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে কারাগারটির ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হয়। এটিই বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। বেঙ্গল জেল কোডে যে কয়টি কারাগারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার অন্যতম। প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে এবং বন্দি সংখ্যার আধিক্য বিবেচনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কারাগার।
কালের স্বাক্ষী হয়ে থাকা ঢাকার এই কেন্দ্রীয় কারাগার বন্দিশালাকে চিরদিনের জন্য ছুটি দিয়ে হাজতি ও কয়েদীরা চলে যাচ্ছেন তাদের নতুন ঠিকানা কেরানীগঞ্জে। তবে, অটুট থাকবে ভেতরে থাকা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর ও জাতীয় চার নেতার যাদুঘর। যেখানে হত্যা করা হয় তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মহসিন আলীকে।
কারগারের ভেতরের হাসপাতাল ভবনসহ আরো দু-একটি স্থাপনা থাকবে পুরোনো রূপে। বাকি জায়গায় গড়ে উঠবে খোলা পার্ক, কৃত্রিম লেক, সুইমিং পুল, বহুতল গাড়ি পার্কিং, সিনেমা হলসহ মাল্টি কমপ্লেক্স। এখানে থাকা প্রায় ৮ হাজার বন্দিকে কেরানীগঞ্জের নতুন কারাগারে সরানোর পরই শুরু হবে নির্মাণ কাজ।
কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, নাজিমউদ্দিন রোড থেকে কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে স্থানান্তর করা হবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। তিনি বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের সময় বন্দী নারীদের গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে নেওয়া হবে। পরে তাঁদের কেরানীগঞ্জে নতুন কারা ভবনে আনা হবে।
অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুরে ১৯৪ একরের বেশি জমিতে তৈরি হয়েছে নতুন কারাগার। এর মধ্যে ৩০ একর জমিতে বন্দীদের জন্য ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এসব ভবনে চার হাজার পুরুষ ও আলাদা ভবনে ২’শ নারী বন্দীর ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে আট হাজারের মতো বন্দী থাকতে পারবে। বর্তমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৮’শ ২৬ জন, আছেন ৭ হাজার ৩’শ জন। এই কারাগারে ১’শ ৬০ জন নারী বন্দী আছেন। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সরে গেলে ১৭ একর জমি খালি হবে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভূমির পরিমাণ ৩৬.৭৬ একর। এর মধ্যে পেরিমিটার ওয়ালের ভেতরে অর্থাৎ কারা অভ্যন্তরে জমির পরিমাণ ১৭.৫৫ একর, পেরিমিটার ওয়ালের বাইরে ১৯.২১ একর। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ওয়ার্ড ৪৮টি, সেল ভবন ১২ টি, সেলের কক্ষ ২৩৩ টি, রান্নাঘর ৫টি, ওয়ার্ক সেড ৬টি, মেরামত প্রশিক্ষণ শেড ৪টি, কারা বেকারি ১টি, ডে-কেয়ার সেন্টার ১টি ও মাল্টিপারপাস শেড আছে ১টি। তাছাড়া বন্দিদের সাক্ষাতের জন্য একটি দ্বিতল ভবন ও প্রধান ফটক সংলগ্ন অফিস ভবন রয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৮ জন পুরুষ, ডিটেনশন প্রাপ্ত ৫ জন পুরুষ, বিচারাধীন ৫’শ ৭৪ জন পুরুষ ও ৮০ জন মহিলা, ১ হাজার ৮’শ ৬৮ জন পুরুষ ও ৫৪ জন মহিলা সাজাপ্রাপ্ত এবং ১’শ অন্যান্য পুরুষ শ্রেণির অর্থাৎ সর্বমোট ২ হাজার ৬’শ ৮২ জন বন্দি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি কারাগার। কিন্তু বর্তমানে এ কারাগারে প্রতিদিন গড়ে ধারণ ক্ষমতার প্রায় চার গুণ বন্দি আটক থাকে।
মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের দন্ড কার্যকর করার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১টি ফাঁসির মঞ্চ আছে। বিধি মোতাবেক একজন ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার, জেলসুপারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়ে থাকে। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দিন-ক্ষণ নির্ধারণের পর দন্ডকার্যকর করার পূর্বে ডাক্তার দ্বারা দন্ডিত ব্যাক্তির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। তারপর জল্লাদ তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যায়।
এই রীতি মেনে শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কত ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও বিগত সরকারগুলোর আমলে চাঞ্চল্যকর মামলার সকল ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে ফাঁসির মঞ্চে। এ সরকারের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার দায়ে আটককৃত ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্তদের রায় কার্যকর করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রায় দন্ডিতদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে এ কারাগারে।
কারাগারের বন্দিদের স্থানান্তরের আগে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হলে ২’শ বছরের ইতিহাসের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের সমাপ্তি ঘটবে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের শেষ ফাঁসি মতিউর রহমান নিজামীর কিনা ? এ খবরের প্রতিক্ষায় অনেকেই।
দিয়া ইসলাম / ৬৪৫
