স্টাফ রিপোর্টার,১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ (বিবিনিউজ):সাভারের আশুলিয়ার অজপাড়া গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক অস্ট্রেলিয়ান নারীর অর্ধগলিত মৃতদেহ। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল ও ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের অনুরোধে নিখোঁজ রেহানার সন্ধান করতে গিয়েই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আশুলিয়ার চাকলগ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায় পুঁতে রাখা লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। আর এর মাধ্যমে উদঘাটিত চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের মোটিভ।
নিহতের নাম রেহানা পারভীন (৩৭)। তিনি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার পাতিলঝাঁপ গ্রামের লেহাজ উদ্দিন এর মেয়ে। রাত ১০ দশটায় চাকলগ্রামের চৌরাপাড়ায় ওই বাড়িটি ঘিরে দেখা গেছে শত শত মানুষের ভিড়। মাটি খুঁড়ে গভীরতা এগুচ্ছে আর দূর থেকেই ভেসে আসছিল পচা লাশের উৎকট দুর্গন্ধ।
ঢাকা জেলা দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, ১৬ বছর আগে ব্যারিস্টারি পড়তে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান রেহানা পারভিন। সেখানেই পরিচয় হয় নবাবগঞ্জের সন্তান আওলাদ হোসেনের সঙ্গে। গ্রহণ করেন দেশটি নাগরিকত্ব। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে এই দম্পতির রয়েছে তিন মেয়ে ও এক ছেলে।
সূত্রমতে, দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক বিরোধ চলছিল এই দম্পতির। মারধর, হত্যার চেষ্টা সহ পারিবারিক সহিংসতার বিষয়টি গড়ায় সে দেশের আদালত পর্যন্ত।
রেহানা পারভীনের মা আইরিন আক্তার জানান, “আমি অনেক কষ্টে জায়গা জমি বিক্রি করে স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে অস্ট্রেলিয়ান পাঠিয়েছিলাম। আশা ছিল আমার মেয়ে বড় ব্যারিস্টার হবে। আজ মা হিসেবে আমার মেয়ের পচা গলা লাশ তোলা হচ্ছে। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার পর তাকে দাফন কাফন করা হয়নি পরনের কাপড় দিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। আমি এই কষ্ট কোথায় রাখবো বাবা আমি এর বিচার চাই।
রেহানা পারভীনের ভাই মোহাম্মদ রবিন জানান, তিন মাস আগে বড় ভাগ্নি আহাদ নূরকে নিয়ে আমার বোন একাই অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরেন। পরে জানতে পারি তার স্বামী ও এক মাস পর দেশে ফেরে। ভাগ্নিকে রাখা হয়েছে তার দাদীর বাড়িতে। তারপর থেকে শুনি আমার বোন নিখোঁজ। আজ তার মরদেহ তোলা হচ্ছে। বিচার চাওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। সূত্র মতে, রেহেনা পারভীনের অস্ট্রেলিয়ার ফেরার টিকিট কনফার্ম করার পরও তিনি ফেরেননি। কিন্তু স্বজনদের অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ফিরে গেছেন।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া থাকা তিন সন্তান দীর্ঘ সময় মাকে না পেয়ে বিষয়টি দেশে মামা এবং নারীকে জানালে সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
রেহানার মা আইরিন আক্তার ঢাকা নবাবগঞ্জ থানায় প্রথম একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন ও তাদের অনুরোধে সারা দেয় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল।
তদন্তকারীর সূত্র মতে, ইন্টারপোল অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক হিসেবে রেহানা পারভীনের সন্ধান চেয়ে প্রথমে বাংলাদেশের পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কে চিঠি লেখে।
সেই চিঠির তদন্তের ভার দেয়া হয় ঢাকা জেলাকে। ইন্টারপোলের দেয়া তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পুলিশ সন্দেহভাজন আসামিদের সন্ধানে বেশ কয়েকটি জেলায় অভিযান চালায়।
এক পর্যায়ে পুলিশ আটক করে রেহানা পারভীনের ননদ পাপিয়া আক্তার ও তার সহযোগী আমজাদ হোসেনকে।
তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পাপিয়া আক্তারের বাড়ির আঙিনা থেকে উদ্ধার করা হয় রেহানা পারভীনের গলিত মৃতদেহ।
লাশ গুমের ঘটনায় আটক সন্দেহভাজন আমজাদ হোসেন সম্পর্কে রেহানা পারভীনের চাচা। তিনি জানান অপর দু’জন লোকের সহযোগিতায় কোদাল দিয়ে মাটি কেটে লাশটি পুঁতে ফেলা হয়।
সম্পত্তি আত্মসাৎ ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ মাটি চাপা দিতেই এভাবে রেহানা পারভীনকে হত্যার পর পুঁতে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
ঢাকা জেলা দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, চাঞ্চল্যকর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রেহানা পারভিন অপহরণ মামলার রহস্য উদঘাটন ও লাশ উদ্ধার সংক্রান্তে আজ প্রেস ব্রিফিং করবেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আহমেদ মুঈদ।
সুরতহাল শেষে রেহানা পারভীনের অর্ধ-গলিত লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
প্রথমে নিখোঁজ পরে অপহরণ মামলা। অতঃপর আসামিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের লাশ উদ্ধারের পর তা হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাভারের আশুলিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়ান নারীর অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার
